ইরানে মূল্যস্ফীতি ও জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন নিয়ে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট টানা তৃতীয় দিনের মতো অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হয়ে এই আন্দোলন এখন দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজারে দোকানিরা ধর্মঘটে গেলে বিক্ষোভের সূচনা হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
ওই দিন খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।
এরপর থেকে বিবিসি পারসিয়ান যাচাইকৃত ভিডিওতে কারাজ, হামেদান, কেশম, মালার্দ, ইসফাহান, কেরমানশাহ, শিরাজ ও ইয়াজদ শহরে বিক্ষোভের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে।
ইরান সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এই বিক্ষোভ স্বীকার করে এবং কঠোর ভাষার মুখোমুখি হলেও ধৈর্যের সঙ্গে শুনবে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন বিক্ষোভকারীদের তথাকথিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে, যাতে সমস্যা সমাধানে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
এ সময় তিনি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোহাম্মদ রেজা ফারজিনের পদত্যাগ গ্রহণ করেন এবং তার স্থলে সাবেক অর্থ ও অর্থমন্ত্রী আবদোলনাসের হেমমাতিকে নিয়োগ দেন।
বিক্ষোভে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও যোগ দিয়েছেন। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন, যার মধ্যে রয়েছে ‘ডিক্টেটরের মৃত্যু হোক’ — যা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে। তিনি দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।
কিছু বিক্ষোভকারী ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলের পক্ষে স্লোগানও দেন, যেমন— শাহ দীর্ঘজীবী হোন।
এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত অবস্থায় থাকা রেজা পাহলভি এক্সে লেখেন, আমি আপনাদের পাশে আছি। বিজয় আমাদেরই হবে, কারণ আমাদের দাবি ন্যায়সংগত এবং আমরা ঐক্যবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, এই শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পারসিয়ান ভাষার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহসের প্রশংসা করে এবং ব্যর্থ নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার পর মানুষ যে ‘মর্যাদা ও ভালো ভবিষ্যৎ’ চায়, সে দাবির পাশে রয়েছে।
এদিকে, সোমবার ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে ইরান ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য ছিল বলে জানা গেছে। বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইরানে শাসন পরিবর্তন সমর্থন করেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। তবে তিনি বলেন, “তাদের ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি রয়েছে, অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, মানুষও খুব একটা খুশি নয়।”
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, ইরান যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করে, তবে ইসরায়েলের আরেক দফা বিমান হামলাকে তিনি সমর্থন করতে পারেন।
মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে কোনও নিপীড়নমূলক আগ্রাসনের জবাব হবে কঠোর ও অনুশোচনামূলক।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি গত সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, ইসরায়েল সরকার চেয়েছিল যুদ্ধের সময় ইরানে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ুক এবং শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ুক।
মন্তব্য করুন