আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ভেনেজুয়েলা। আন্দিজের পর্বতচূড়া থেকে শুরু করে ক্রান্তীয় অরণ্য আর নয়নাভিরাম বেলাভূমি—সব মিলিয়ে এক বৈচিত্র্যময় দেশ। ৩০০ বছরেরও বেশি সময় স্প্যানিশ উপনিবেশ থাকা এই দেশটিতে একসময় মুসলমানের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ভেনেজুয়েলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে মুসলমানরা এখন এক অবিচ্ছেদ্য ও শক্তিশালী অংশ।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদন ২০২১’ অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার ২৯ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে বর্তমানে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় এক থেকে দেড় লাখ।
আগমনের ইতিহাস: ভেনেজুয়েলায় মুসলমানদের আগমনের ইতিহাস বেশ পুরনো। ঔপনিবেশিক যুগে উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের মাধ্যমে প্রথম ইসলামের আগমন ঘটে। তবে তৎকালীন শাসকদের কঠোর দমন-পীড়নের কারণে তারা গোপনে ধর্মচর্চা করতে বাধ্য হতেন।
আধুনিক মুসলিম সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। উসমানীয় শাসনের পতনের পর লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন থেকে অভিবাসীরা দারিদ্র্য ও অস্থিরতা থেকে বাঁচতে ভেনেজুয়েলায় পাড়ি জমান। শুরুতে এদের অনেকে খ্রিস্টান হলেও তাদের সঙ্গে সুন্নি, শিয়া ও দ্রুজ মুসলমানদের একটি বড় অংশও বসতি স্থাপন করে।
অর্থনীতিতে অবদান ও ‘লা তুরকেরিয়া’: মুসলিম অভিবাসীরা প্রথমে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী বা ‘কোতেরো’ হিসেবে অর্থনীতিতে প্রবেশ করেন। কঠোর পরিশ্রম ও গ্রাহকসেবার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে কারাকাসে স্থায়ী ব্যবসা গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ‘লা তুরকেরিয়া’ বাণিজ্যিক এলাকাটি তাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ভেনেজুয়েলার তেলভিত্তিক অর্থনীতির উত্থান মধ্যপ্রাচ্য থেকে দ্বিতীয় দফায় মুসলমানদের আকৃষ্ট করে। এ সময় তারা খুচরা ব্যবসা ছেড়ে শিল্প, সেবা ও পেশাজীবী খাতে প্রবেশ করেন। সত্তরের দশকের শেষ নাগাদ দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের আরব-ভেনেজুয়েলানরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চিকিৎসা, প্রকৌশল ও সরকারি প্রশাসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেন।
লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ মিনার: ভেনেজুয়েলায় ইসলামের সবচেয়ে বড় প্রতীক রাজধানী কারাকাসের ‘শেখ ইব্রাহিম বিন আবদুল আজিজ আল ইব্রাহিম মসজিদ’। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নির্মিত উসমানীয় স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদে রয়েছে লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ মিনার। এটি শুধু ইবাদতখানা নয়; বরং গ্রন্থাগার, সম্মেলন ও ক্রীড়া কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক ও ইরানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃশ্যমানতা বেড়েছে। রমজানের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো এখন সরকারিভাবে স্বীকৃত। কারাকাস ও মার্গারিটা দ্বীপের স্কুলগুলোতে জাতীয় পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি ইসলামি মূল্যবোধ ও আরবি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। গড়ে উঠেছে হালাল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক।
সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলায় ইসলাম এখন আর কোনো বহিরাগত সংস্কৃতি নয়, বরং জাতীয় জীবনের এক সম্মানিত ও বৈধ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এম.এম/সকালবেলা
মন্তব্য করুন